বগুড়ার শেরপুর পৌরসভায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ পাওয়া সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে অধিকাংশ কাজ দৃশ্যমান নয়। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। অথচ দাপ্তরিক নথিতে সবগুলো প্রকল্প ‘প্রায় সম্পন্ন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনটি কিস্তিতে শেরপুর পৌরসভার জন্য মোট ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩২৯ টাকা ৫৫ পয়সা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অনুমোদিত সাতটি প্রকল্প হলো—শিশু পার্ক সংস্কার, শিল্পকলা একাডেমি সংস্কার, মডেল মসজিদের চেয়ার ও দানবাক্স, উপজেলা পরিষদের হলরুম সংস্কার, টেনিস কোর্টে ওয়াশরুম ও চেঞ্জরুম নির্মাণ, পৌর কার্যালয়ে আইপিএস স্থাপন এবং পৌর এলাকায় প্লাস্টিক বিন স্থাপন।
তবে প্রকল্পগুলো পৌর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হলেও অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে উপজেলা পরিষদকেন্দ্রিকভাবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা এবং শেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. জানে আলম খোকা অভিযোগ করেন, এই প্রকল্প বণ্টন ছিল একতরফা ও পক্ষপাতমূলক। কারণ ইউএনও একইসাথে পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকায় তিনি পৌরসভার চাহিদা বিবেচনায় না এনে উপজেলা কেন্দ্রীক প্রকল্প গ্রহণ করেছেন।
টিআর বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শুরু এবং অর্থবছরের মধ্যেই শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ ১ম ও ২য় কিস্তির পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও মাঠপর্যায়ে শুধু শিশুপার্কে কিছু মাটি ফেলানো এবং মসজিদের চেয়ার ও দানবাক্স স্থাপনের কাজ ছাড়া অন্য কোনো প্রকল্পের কাজ শুরুই হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত সাতজন সভাপতির মধ্যে চারজনই উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের প্রতিনিধি, বাকিরা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও মসজিদের ইমাম। কিন্তু তাদের বক্তব্যে রয়েছে ব্যাপক ভিন্নতা ও অসঙ্গতি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আশিক খান দাবি করেন, “সবগুলো প্রকল্প প্রায় সম্পন্ন, সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে।” তবে উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল মজিদ বলেন, “শুধু শিশু পার্কে কিছু কাজ হয়েছে, বাকিগুলোর কাজ দ্রুত শুরু হবে।”
সবচেয়ে বিতর্কিত হয়েছে শিল্পকলা একাডেমি সংস্কার প্রকল্প। প্রকল্প সভাপতি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা জানান, একটি কক্ষ সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৌশল দপ্তরের তথ্যমতে, এই সংস্কার কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আওতায় ই-জিপি টেন্ডারের মাধ্যমে, টিআর প্রকল্পের নয়।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, “টিআর বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করা বিধিসম্মত নয়। কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও এটি নিয়মভঙ্গের শামিল।”
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজ বলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়নযোগ্য এসব প্রকল্প যথাযথভাবে না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এই অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়।